বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জেলা কুড়িগ্রাম। এটি দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এবং রংপুর বিভাগের অন্তর্গত। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমারসহ বহু নদ-নদীবেষ্টিত এই জেলা তার অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিচিত।
কুড়িগ্রাম জেলার উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্য, দক্ষিণে গাইবান্ধা, পূর্বে লালমনিরহাট ও আসাম, এবং পশ্চিমে রংপুর ও নীলফামারী জেলা অবস্থিত। এই জেলার আয়তন প্রায় ২২৪৫.০৪ বর্গকিলোমিটার।
কুড়িগ্রামকে নদীবাহিত জেলা বলা হয়, কারণ এটি বাংলাদেশে সর্বাধিক নদীপ্রবাহিত অঞ্চলের মধ্যে একটি। এখানকার প্রধান নদীগুলো হলো— ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, জিঞ্জিরাম, ফুলকুমার প্রভৃতি। এসব নদী জেলার কৃষি, জীবিকা এবং জীবনধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বর্ষাকালে নদীগুলোতে ভয়াবহ বন্যা হয়, যা স্থানীয়দের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কুড়িগ্রাম মূলত কৃষিনির্ভর জেলা। এখানকার প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, ভুট্টা, আলু, সরিষা ইত্যাদি। এছাড়াও, মাছ চাষ ও গবাদিপশু পালন এই জেলার মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এখানকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষি, শ্রমিক, ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল।
কুড়িগ্রামের জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মিশেলে গঠিত। এখানকার প্রধান ভাষা বাংলা হলেও স্থানীয় কিছু উপজাতি জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ধারণ করে। মঙ্গলশোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, নবান্ন উৎসব, গ্রামীণ যাত্রাপালা, সার্কাস ও বাউল গানের আসর এখানকার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কুড়িগ্রামে বেশ কিছু প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১. ধরলা সেতু: কুড়িগ্রাম শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ধরলা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান।
2. চিলমারী বন্দর: একসময় চিলমারী বন্দর ছিল দেশের অন্যতম প্রধান নৌবন্দর। বর্তমানে এটি নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
৩. ভূরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরী জমিদারবাড়ি: এই প্রাচীন স্থাপনাগুলো কুড়িগ্রামের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
৪. রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র: এটি দেশের অন্যতম প্রধান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র।
কুড়িগ্রামে শিক্ষার হার তুলনামূলক কম হলেও বর্তমান সরকার শিক্ষার প্রসারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ, চিলমারী ডিগ্রি কলেজসহ বেশ কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কুড়িগ্রামের প্রধান সমস্যা নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও বন্যা। তবে কৃষি, পর্যটন এবং নৌপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করলে এই জেলা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, কুড়িগ্রাম তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য এবং সম্ভাবনার এক অপার ভাণ্ডার। উপযুক্ত পরিকল্পনা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এটি একদিন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পরিণত হতে পারে।
কুড়িগ্রাম জেলা বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে অবস্থিত একটি জেলা। এটি দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এবং ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদীবাহিত একটি অঞ্চল।
কুড়িগ্রাম জেলায় মোট ৯টি উপজেলা রয়েছে:
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (KuriAU) বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলায় অবস্থিত একটি সরকারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের কৃষি শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২০ সালে, যখন জাতীয় সংসদে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিল পাস হয়। ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর “কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২১” কার্যকর হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর ২৬ এপ্রিল ২০২২ সালে অধ্যাপক এ কে এম জাকির হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।
অবস্থান ও ক্যাম্পাস
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার নালিয়াদোলা এলাকায় ধরলা নদীর পশ্চিম তীরে প্রায় ২৫০ একর জমিতে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্যাম্পাসটি কুড়িগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং চিলমারী নদীবন্দর থেকে ২৬ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত হবে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম কুড়িগ্রাম শহরের ভোকেশনাল মোড়ে এবং একাডেমিক কার্যক্রম টেক্সটাইল মোড় রেলগেট-সংলগ্ন এলাকায় ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে।
শিক্ষা কার্যক্রম ও অনুষদসমূহ
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে দুটি অনুষদ রয়েছে:
কৃষি অনুষদ: এই অনুষদে কৃষি বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের উপর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
মৎস্য অনুষদ: এখানে মৎস্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষা প্রদান করা হয়।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এই দুটি অনুষদে মোট ৮০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে কৃষি অনুষদে ৪০ জন এবং মৎস্য অনুষদে ৪০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারেন। Pro
ভর্তি প্রক্রিয়া
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি গুচ্ছভুক্ত নয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা মেধাতালিকার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ভর্তি কার্যক্রম ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত চলেছে, এবং জানুয়ারি ২০২৫ থেকে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছে যেখানে “কৃষির রূপান্তরে, স্মার্ট ক্যাম্পাস বিনির্মাণে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা” তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি আধুনিক কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ, গবেষণা ল্যাবরেটরি স্থাপন, এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সমাপনী মন্তব্য
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের কৃষি শিক্ষায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, গবেষণা, এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণে এই বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের মাধ্যমে এটি দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
কুড়িগ্রাম জেলায় মোট ৯টি থানা (উপজেলা) রয়েছে। এগুলো হলো:
এই উপজেলাগুলো কুড়িগ্রাম জেলার প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের পাশাপাশি কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় কুড়িগ্রাম ১১ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বিশেষ করে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কুড়িগ্রামসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
কুড়িগ্রাম জেলা নদীবাহিত একটি অঞ্চল এবং এখানে অনেকগুলো নদী প্রবাহিত হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
এছাড়াও, জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও ছোট-বড় অনেক নদী ও শাখা নদী প্রবাহিত হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এসব নদীর প্রভাব অনেক বেশি অনুভূত হয়।
কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস বাংলাদেশের রেলওয়ের একটি আন্তঃনগর ট্রেন, যা ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম রুটে চলাচল করে। ট্রেনটি সপ্তাহে ছয় দিন চলাচল করে এবং বুধবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে।
সময়সূচী:
ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম: রাত ৮:৪৫ মিনিটে ছেড়ে ভোর ৬:১৫ মিনিটে কুড়িগ্রাম পৌঁছায়।
কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা: সকাল ৭:২০ মিনিটে ছেড়ে বিকেল ৫:২৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছায়।
টিকিটের মূল্য:
শোভন চেয়ার: ৬৪০ টাকা
স্নিগ্ধা: ১,২২৫ টাকা
এসি বার্থ: ২,১৯৭ টাকা
যাত্রাবিরতি স্টেশনসমূহ:
কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ট্রেনটি যাত্রাপথে নিম্নলিখিত স্টেশনগুলোতে বিরতি দেয়:
বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন
নাটোর রেলওয়ে স্টেশন
সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশন
জয়পুরহাট রেলওয়ে স্টেশন
পার্বতীপুর রেলওয়ে স্টেশন
বদরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন
রংপুর রেলওয়ে স্টেশন
কাউনিয়া রেলওয়ে স্টেশন
টিকিট সংগ্রহের জন্য আপনি বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং সেবা ব্যবহার করতে পারেন। এটি আপনাকে ঘরে বসেই টিকিট বুকিং করার সুবিধা প্রদান করে।
ভ্রমণের আগে সর্বদা সর্বশেষ সময়সূচী ও টিকিটের মূল্য যাচাই করে নিন, কারণ সময় ও মূল্য পরিবর্তিত হতে পারে।